শবে মেরাজ: নবিজী ﷺ–এর ঊর্ধ্বগমন ও উম্মতের জন্য আসমানি দান
শবে মেরাজ: নবিজী ﷺ–এর ঊর্ধ্বগমন ও উম্মতের জন্য আসমানি দান।
~কবি ক্বারী মুহাম্মদ আব্দুর রহমান আল সজিব
লেখক ও সমসাময়িক চিন্তাবীদ
______________________________________________
শবে মেরাজ ইসলামের ইতিহাসে শুধু একটি স্মরণীয় রাত নয়; এটি মূলত নবিজী হযরত মুহাম্মদ ﷺ–এর সঙ্গে তাঁর রবের সম্পর্কের এক গভীর প্রকাশ। দুঃখ, অবহেলা আর কষ্টে ভরা সময়ের মাঝেই আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবীকে এমন এক সম্মানে ভূষিত করেন, যা মানুষের চিন্তার সীমাকেও অতিক্রম করে।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে এই ঘটনার সূচনা এভাবে করেছেন—
“পবিত্র সেই সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে এক রাতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় ভ্রমণ করালেন—যার আশপাশ আমি বরকতময় করেছি—তাঁকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখানোর জন্য।”
(সূরা আল-ইসরা: ১)
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা নবিজী ﷺ–কে ‘রাসূল’ বা ‘নবী’ না বলে ‘তাঁর বান্দা’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এতে বোঝা যায়, আল্লাহর কাছে সর্বোচ্চ মর্যাদা হলো বান্দা হওয়া। সেই পরিপূর্ণ বান্দাকেই আল্লাহ আসমানের পথে আহ্বান করেছেন।
সহিহ হাদিস থেকে জানা যায়, শবে মেরাজের রাতে নবিজী ﷺ–এর বক্ষ বিদীর্ণ করে তা জমজমের পানি দিয়ে ধৌত করা হয়। এরপর তাঁকে বোরাকে আরোহণ করানো হয় এবং জিবরাইল (আ.)–এর সঙ্গে তিনি মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছান। সেখানে তিনি পূর্ববর্তী সকল নবীর ইমাম হয়ে নামাজ আদায় করেন। এটি প্রমাণ করে, নবিজী ﷺ কেবল শেষ নবী নন; বরং সকল নবীর নেতা।
এরপর শুরু হয় মেরাজ—ঊর্ধ্বগমন। এক আসমান থেকে আরেক আসমানে উঠতে গিয়ে তিনি বিভিন্ন নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আদম (আ.) তাঁকে স্বাগত জানান, ঈসা (আ.) ও ইয়াহইয়া (আ.) সাক্ষাৎ দেন, ইউসুফ (আ.)–এর সৌন্দর্য, ইদরিস (আ.)–এর মর্যাদা, হারুন (আ.)–এর কোমলতা এবং মুসা (আ.)–এর উম্মতের প্রতি দরদ—সবই নবিজী ﷺ প্রত্যক্ষ করেন। শেষ আসমানে তিনি ইবরাহিম (আ.)–এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যিনি বায়তুল মামুরের নিকটে অবস্থান করছিলেন।
এরপর নবিজী ﷺ পৌঁছান সিদরাতুল মুনতাহায়। সহিহ হাদিসে এসেছে, এখানেই জিবরাইল (আ.) থেমে যান এবং বলেন, এর পর এক কদমও এগোলে তিনি জ্বলে যাবেন। কিন্তু নবিজী ﷺ একাই এগিয়ে যান—কারণ তিনি আল্লাহর হাবীব।
এই মহিমান্বিত সাক্ষাতের সময়ই আল্লাহ তাআলা উম্মতের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার প্রদান করেন—নামাজ। প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। মুসা (আ.)–এর পরামর্শে নবিজী ﷺ বারবার আল্লাহর দরবারে ফিরে যান। শেষ পর্যন্ত তা পাঁচ ওয়াক্তে নির্ধারিত হয়, তবে সওয়াব রাখা হয় পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমান। এ কারণেই বলা হয়, নামাজ হলো মুমিনের মেরাজ।
এই রাতেই নবিজী ﷺ সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত লাভ করেন এবং উম্মতের জন্য এ সুসংবাদ দেওয়া হয়—যে ব্যক্তি শিরক ছাড়া আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে, আল্লাহ চাইলে তার বড় গুনাহও ক্ষমা করে দেবেন।
আল্লাহ'র হাবিব হজরত মুহাম্মদ ﷺ বলেন,
"যখন (মি'রাজের বিষয়ে) কুরাইশরা আমাকে অস্বীকার করলো, তখন আমি কা'বা শরিফের হিজর অংশে দাঁড়ালাম। আল্লাহ ﷻ তখন আমার সম্মুখে বায়তুল মুকাদ্দাসকে প্রকাশ করে দিলেন, যার ফলে আমি দেখে দেখে বায়তুল মুকাদ্দাসের নিদর্শন সমূহ তাদের কাছে বর্ণনা করছিলাম।"
[সহিহ বুখারি ৩৮৮৬]
শবে মেরাজের আরেকটি গভীর দিক হলো—এটি আসে নবিজী ﷺ–এর জীবনের সবচেয়ে বেদনাবিধুর সময়ে। খাদিজা (রা.) নেই, আবু তালিব নেই, তায়েফের পাথরের আঘাত এখনো স্মৃতিতে তাজা। ঠিক তখনই আল্লাহ তাআলা যেন বলে দিলেন—দুনিয়া যদি অবহেলা করে, আসমান তোমার জন্য উন্মুক্ত।
শবে মেরাজ আমাদের শুধু একটি অলৌকিক ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয় না; বরং দায়িত্বের কথাও স্মরণ করায়। যে নবী ﷺ উম্মতের জন্য আসমান পাড়ি দিয়েছেন, তাঁর দেওয়া নামাজকে অবহেলা করা আমাদের জন্য কত বড় ক্ষতি—তা গভীরভাবে ভাবার বিষয়।
মহব্বত মানে শুধু মুখে ভালোবাসার দাবি নয়; মহব্বত মানে সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা, নামাজকে জীবনের কেন্দ্র বানানো এবং কষ্টের সময় আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শবে মেরাজের শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করার তাওফিক দিন। নবিজী ﷺ–এর প্রকৃত উম্মত হিসেবে কবুল করুন—আমিন।

Comments
Post a Comment